আন্তর্জাতিক

ভিসা বাতিল, ফেরদৌসকে 'ব্ল্যাক লিস্টেড' ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের-

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 

ভারতের লোকসভা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। একজন বিদেশি নাগরিক হয়ে অন্য দেশের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে ভিসা আইনে ফেরদৌসের বিজনেস ভিসা বাতিল করল ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই সাথে তার বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে তাকে দ্রুত ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই দেশে ফিরে গেছেন ফেরদৌস।

মঙ্গলবারই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশি নাগরিক মিস্টারের ফেরদৌস আহমেদ ভিসা নীতি লঙ্ঘন করেছেন-‘ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন’ এর পক্ষ থেকে এই রিপোর্ট পাওয়ার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিজনেস ভিসা বাতিল করেছে এবং তার বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে তাকে দ্রুত দেশে ফেরত যেতে বলা হয়েছে। ফেরদৌসকে ব্ল্যাক লিস্ট করা হয়েছে।’ 

সূত্রে খবর, ভারতের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার জন্য কোন বিদেশি নাগরিককেই কোন ক্যাটাগরিতেই ভিসা ইস্যু করা হয় না। কিন্তু বিজনেস ভিসা নিয়ে সেই নীতি ভেঙেছেন বলেই অভিযোগ ফেরদৌসের বিরুদ্ধে। বিষয়টি কার্যকর করতে কলকাতায় ফরেনারস রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও)-কে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

 

এর আগে, এদিন দুপুরের দিকে ভারতের নির্বাচনে বিদেশি নাগরিককে কেন ব্যবহার করা হল তা জানতে চেয়ে কলকাতায় এফআরআরও-এর কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এফআরআরও-এর কাছে জানতে চায় বাংলাদেশি অভিনেতা ফেরদৌস রাজনৈতিক প্রচারণায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েছিলেন কি না বা তিনি ভিসা আইন লঙ্ঘন করেছেন কিনা। এরপরই তার বিরুদ্ধে ভিসা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে রিপোর্ট পাঠায় এফআরআরও। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই তার ভিসা বাতিল করার পাশাপাশি তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। 

গত ১৪ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়ালের সমর্থনে একটি প্রচারণায় অংশ নেন ফেরদৌস। হুড খোলা গাড়িতে করে অভিনেতাকে সাথে নিয়ে রোড শো করেন কানাইয়ালাল। ফেরদৌসের সাথেই একই গাড়িতে ছিলেন টালিগঞ্জের অভিনেতা অঙ্কুশ ও অভিনেত্রী পায়েল সরকার। করণদিঘি থেকে সেই রোড শো যায় ইসলামপুর পর্যন্ত। ফেরদৌসকে এও বলতে শোনা যায় ‘তৃণমূল কংগ্রেস ও দিদি (মমতা)-কে ভোট দেওয়া উচিত।’ 

ফেরদৌসসহ সিনেমা জগতের সেলিব্রিটিদের দেখতে রাস্তার দুইপাশে ছিল উৎসাহী মানুষের ভিড়। ফেরদৌসসহ অন্যরা কখনও হাত নাড়িয়ে কখনও বা হাত জোড় করে মানুষের অভিনন্দন গ্রহণ করেন। ওইদিন রায়গঞ্জের পাশাপাশি হেমতাবাদেও আরেকটি রোড শো-এ অংশ নেন। পরদিন ১৫ এপ্রিল করণদিহি এবং চাকুলিয়ায় দুইটি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন ফেরদৌস। 

ফেরদৌসের এই প্রচারণার খবর দুই বাংলাতেই গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। কিন্তু ভারতের নির্বাচনী প্রচারণায় বিদেশি অতিথিকে নিয়ে আসার ঘটনায় বিরোধী দলগুলি প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ জনপ্রিয় অভিনেতাকে কাছে পেয়ে খুশি হলেও বিরোধীদের প্রশ্ন নিজেদের দেশের সরকার গড়ার নির্বাচনে ভিন দেশের নাগরিক কেন প্রচারণায় অংশ নেবেন? 

রাজ্যের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রশ্ন তোলেন, ‘ভারতের একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিভাবে বিদেশি নাগরিককে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রোড শো করাচ্ছে? আগে কখনও এমনটা দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন ‘আগামীকাল হয়তো আমাদের মমতা ব্যানার্জি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে দিয়ে তৃণমূলের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার জন্য ডাকতে পারেন। আমরা এই ঘটনার নিন্দা জানাই।’ তিনি আরও বলেন ‘একজন বাংলাদেশি অভিনেতাকে ব্যবহার করে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল উত্তর দিনাজপুর জেলার ৫০ শতাংশ মুসলিম ভোট টানতে চাইছে। তৃণমূল আসলে আমাদের দেখে ভয় পেয়ে গেছে, তাই বিদেশ থেকে অভিনেতা নিয়ে আসছে।’ 

যদিও ফেরদৌসের পাশে দাঁড়িয়ে কানাইয়ালালের নির্বাচনী এজেন্ট মুসারফ হুসেন জানিয়েছিলেন, ‘ফেরদৌস বাংলাদেশে একজন জনপ্রিয় অভিনেতা। আমরা তাকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীর হয়ে রোড শো-এ উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম এবং তিনিও রাজি হয়েছেন।’ 

মঙ্গলবারই কলকাতায় নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক দফতরে গিয়ে ফেরদৌসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে বিজেপি। রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা আরিজ আফতাবের সাথে দেখা করে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কঠের পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানান বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার। 

যদিও নিজেদের সমর্থনে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে কেউই প্রচারণায় আসতে পারে। নাম প্রকাশ করার শর্তে তৃণমূলের এক শীর্ষ স্থানীয় নেতা জানান, ‘যদি বিরোধীরা (বিজেপি) বলে যে আমরা সংখ্যালঘু ভোট টানার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, তবে বলবো রাম নবমী র‌্যালিতে অস্ত্র হাতে নিয়ে কাদের টানতে চাইছে তারা?”

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পরই নড়ে চড়ে বসে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন। মিশন থেকেই ফেরদৌসের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয় কেন তিনি এখানে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। যদিও ফেরদৌসের তরফে জানানো হয় যেহেতু তিনি এই বাংলায় একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন, বাংলার প্রযোজক, পরিচালক বা অভিনেতা বন্ধুদের সাথে একটা সুমধুর সম্পর্কও রয়েছে। আর সেই সূত্র থেকেই তিনি ওই প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরদৌসের ওই যুক্তিকে খুব একটা ভালভাবে নেয়নি বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন। কমিশনের অভিমত এভাবে নির্বাচনী প্রচারণনায় অংশ নেওয়া যায় না। পরে ফেরদৌসও এই বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপরই উপ-হাইকমিশন থেকে ফেরদৌসকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে।