বাংলাদেশ

যে কারনে ইউনানী চিকিৎসার এত জনপ্রিয়তা

‘জনপ্রিয়তা বাড়ছে ইউনানি বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার' –এই শিরোনামে ২০১৫ সালে একটি খবর প্রকাশিত হয়৷ বলা হয়, গ্রামাঞ্চলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ার সাথে সাথে একহ্ন শহরমুখি হয়ে উঠছে ৷ প্রশ্ন হলো, কেন এই চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ? 

সরকারি হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডাঃ আক্তার জাহান মিলি বলেছিলেন, নতুন আবিষ্কৃত রোগগুলোর কথা বাদ দিলে, পুরনো অনেক রোগই প্রায় পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানীর মাধ্যমে, এর বিশেষত্ব এখানেই৷ বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ লোক হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী চিকিৎসা নেয়৷ এই গবেষণার গবেষক ডাক্তার জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, ‘‘গত ১৫ বছরে এ দেশে হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী চিকিৎসা নেওয়া লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অন্তত চারগুণ৷''

হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী চিকিৎসা কী? ১৭৯০ সালে ওষুধ বিজ্ঞানের জগতে সূচিত হয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন৷ বিজ্ঞানী হানেমান ১৭৯৬ সালে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী নামক একটি চিকিৎসা পদ্ধতি৷ এরপর থেকেই এগিয়ে চলে নতুন ওষুধের অগ্রযাত্রা৷ হানেমানই প্রথম বলেন, ভেষজ বস্তুকে ওষুধ হতে হবে তার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার গুণে৷ সাধারণ ভেষজ গুণগুলি থাকলেই কোনো বস্তু ওষুধ হিসেবে স্বীকৃত হবে না, যতক্ষণ না তার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো হয়৷

একটি বস্তুর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার উন্নয়ন ঘটিয়ে যখন তা সুস্থ মানবদেহে প্রয়োগ করা হবে এবং তার ঔষধি গুণাবলীর প্রকাশ দেখা যাবে, তখন তাকে ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে৷ এভাবে কোনো বস্তুর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে বলা হয় ডাইনামাইজেশন বা পোটেন্টাইজেশন৷ হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানীতে ওষুধ হচ্ছে শক্তির আধার৷ কোনো ওষুধ বস্তুর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার উন্নয়ন ঘটিয়ে যখন শক্তিকরণ করা হবে, তখন তা ওষুধে রূপান্তরিত হবে৷ এ ওষুধ যখন রোগীর দেহে প্রয়োগ করা হবে, তখন তা আরোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে৷ এভাবে অনেক সাধারণ ভেষজগুণাবলিহীন বস্তুও হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানীতে ওষুধে রূপান্তরিত হয়ে রোগীর জন্য আরোগ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷

আমরা বলছি, বাংলাদেশ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ৷ আমাদের দেশীয় ওষুধ খাতে ঘটছে একের পর এক বিপ্লব৷ দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধই উৎপাদন হয় দেশে, বিশ্বের প্রায় ১১৩টি দেশে রপ্তানি হয় বাংলাদেশে তৈরি ওষুধ৷ এত কিছুর পরও দেশে প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে৷

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এখন দেশের ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে৷ এছাড়া দেশের ২৬৬টি ইউনানি, ২০৫টি আয়ুর্বেদিক, ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ও ৩২টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে থাকে৷ বাজারটা দেখলেই বুঝা যায়, এসব চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের চাহিদা বাড়ছে৷

কেন বাড়ছে চাহিদা? একটা উদাহরণ দেই, মনে করুন, একজনের একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে৷ অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো৷ ডাক্তার কী বলবেন? অবশ্যই রোগীকে বলবেন, তাঁর কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে৷ এই অপারেশনের জন্য প্রয়োজন টাকা৷ টাকার পরিমাণটা কত হতে পারে আর কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে একবার ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন৷ তো কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলেই যে ভালো হবে তার নিশ্চয়তা নেই৷

যার টাকা নেই, সে তখন বিকল্প রাস্তা খোঁজে এবং শেষ পর্যন্ত হাজির হয় আয়ুর্বেদিক, ইউনানি কিংবা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসালয়ে৷ সেখানে অল্প টাকায় চিকিৎসা হয়, ফলাফল কী হবে সেটা মানুষ ভাবে না৷ চিকিৎসা শুরু করে, কেননা, কেউ হয়ত এই চিকিৎসায় ভালো হয়েছিল – এমন উদাহরণ তো আছেই!

শুধু কি এই কারণ? মানুষের কিছু গোপন রোগ আছে, যা সে কাউকে বলতে ভয় পায়৷ এসব গোপন রোগের গোপন সমাধান দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎগতিতে গড়ে উঠেছে হারবাল কিংবা হোমিও চিকিৎসালয়৷ এ চিকিৎসায় বিতরণ করা হয় লিফলেট৷ এ সব লিফলেটের নীচে লেখা থাকে বিভিন্ন দাওয়াখানা, হারবাল ও হোমিও চিকিৎসালয়ের ঠিকানা৷

বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী চিকিৎসকদের নিযুক্ত করা হচ্ছে এবং হোমিওপ্যাথিক/আয়ুর্বেদিক/ইউনানী মেডিকেল কলেজ চালানো হচ্ছে৷ 

এ বছর ঢাকায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন, ইউনানি, আয়ূর্বেদ, হারবাল ও হোমিওপ্যাথি বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন৷ ২০১৮ সালের ১৩ থেকে ১৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিনেট ভবনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়৷ আয়োজক কে ছিল, জানেন? ঢাবির ফার্মেসি অনুষদ! এতে বিশ্বের মোট ৩২টি দেশের ৫০ জন, ভারতের ১০০ জন এবং বাংলাদেশের ৬৫০ জনসহ মোট ৮০০ জন শিক্ষাবিদ গবেষক, শিক্ষার্থী, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন৷ তাই আপনি যদি এগুলো বিজ্ঞানসম্মত কিনা – এই প্রশ্ন করেন, তাহলে লোকজন কি আপনার কথা বিশ্বাস করবে? 

এটা সত্য, বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ঔষুধি গাছগাছড়ার উপাদান দ্বারা তৈরি বহু ওষুধ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের পাশাপাশি রোগ নিরাময়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকর আবদান রাখছে৷

সূত্র- ডিডব্লিও