ভোটের-হাওয়া

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম পর্ব সহিংসতা, গুলিতে নিহত ১১

বাংলার দিগন্ত ২৪.কম
দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল মঙ্গলবার সংঘর্ষ, ব্যালট বাক্স ছিনতাইসহ বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ হয়েছে। রাতে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ জন। এ ছাড়া কক্সবাজারের টেকনাফে গুলিতে দুজন, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও নেত্রকোনায় একজন করে নিহত হয়েছেন।

ভোট গ্রহণ চলাকালে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শতাধিক সদস্য আহত হয়েছেন। ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকে গত সোমবার পর্যন্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১০ জন নিহত হন। আহত হন দুই হাজারের বেশি। গতকাল আরও ১১ জনসহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ২১।
গতকাল ৭১২টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছে। রাত একটা পর্যন্ত পাওয়া ২২৪টির বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ১৭৭টি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ১১, বিএনপি ১৮, বিএনপির বিদ্রোহী চার, জাতীয় পার্টির দুই এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১২টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এই ধাপে ৫৪টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন।
গতকাল নির্বাচন চলাকালে প্রায় অর্ধশত প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় গতকাল রাত আরাইটার দিকে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ সোহেল (২৫), শাহাদাত হোসেন (৩০), কামরুল মৃধা (২৫), বেলাল (৩০) ও সোলায়মান (১৯)। তাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজনের বাড়ি পার্শ্ববর্তী ভান্ডারিয়া উপজেলার হরিণতলা গ্রামে। নিহত পাঁচজনই মঠবাড়িয়ার ধানীসাফা ইউপিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী হারুনুর রশিদের কর্মী বলে জানিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক মাতুব্বর। আহত সাতজন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিয়ে ধানীসাফার সাফা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ফল ঘোষণা করতে চাইলে আওয়ামী লীগের কর্মীরা বাধা দেন। এরপরও তিনি ফল ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। খবর পেয়ে র্যাব ও বিজিবির সদস্যরা কেন্দ্রে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি ছোড়ে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মাঝরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় রাত সাড়ে আটটার দিকে দুই সদস্য পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. শফিক আলম ঘটনাস্থলে মারা যান। রাত সাড়ে নয়টার দিকে একই ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইল আল হোসাইনিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্র এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আবদুল গফুর নামের এক ব্যক্তি আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নুর হোসেনের ভাই।
নির্বাচনী এলাকাগুলো ঘুরে দিগন্ত বাংলার নিজস্ব প্রতিবেদক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা বলেছেন, নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র থেকে প্রতিপক্ষের এজেন্টদের বের করে দেওয়া কিংবা ঢুকতে না দেওয়া, বুথ দখল করে এবং ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারা, ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, ভোটকেন্দ্রের বাইরে পেশিশক্তি প্রদর্শন, নির্বাচন কর্মকর্তাকে গুলি করে আহত করাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও পছন্দের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রকাশ্যে ভোট দিতে ভোটারদের বাধ্যও করা হয়েছে। এটি মূলত সরকারদলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। দুই লাইনের একটি ছড়া কেটে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রগুলোতে এই প্রক্রিয়াটির প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন। লাইন দুটি হলো—চেয়ারম্যান ভোট ওপেনে/ অন্যদের ভোট গোপনে।
অধিকাংশ স্থানে হানাহানি, জাল ভোট, জবরদস্তির অভিযোগ উঠেছে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঝালকাঠির রাজাপুর, বরিশালের বাকেরগঞ্জ, ভোলার ইলিশা, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশ গুলি চালায়। আরও কিছু জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। নির্বাচনে জবরদস্তি, জাল ভোট, বুথ দখলের অভিযোগ সরকারদলীয় স্থানীয় নেতারা অস্বীকার করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন কিছু কিছু বিষয় স্বীকার করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
ঢাকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, সার্বিক বিবেচনায় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়ম ও সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে মোট ৬৫টি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করেছে কমিশন।
বিকেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান দলের পক্ষ থেকে সিইসির সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে সব জায়গায়। আর দখল-কারচুপি হয়েছে বেশির ভাগ জায়গায়। এই অবস্থায় অন্তত ৫০টি ইউপির নির্বাচন বাতিল করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আগামী কয়েক দফার নির্বাচনের জন্য এই দৃষ্টান্ত ভালো ফল দিতে পারে।