ভোটের-হাওয়া

শুনানিকালে দুই মন্ত্রীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সংবিধান রক্ষার শপথ ভাঙলে পরিণতি কী?

বাংলার দিগন্ত :হাজিরা দিয়ে আদালত থেকে বের হয়ে আসছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম (বাঁয়ে); হাজিরা দিতে আদালতে প্রবেশ করছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক l আদালত অবমাননার অভিযোগের বিষয়ে শুনানির সময় গতকাল রোববার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে মন্ত্রীদের সংবিধান লঙ্ঘনের পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি।
আদালত অবমাননার অভিযোগের যে ব্যাখ্যা খাদ্যমন্ত্রী দিয়েছেন, তা সর্বোচ্চ আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাঁকে নতুন করে ব্যাখ্যা জমা দেওয়া এবং এ বিষয়ে শুনানির জন্য ২৭ মার্চ তারিখ পুনর্নির্ধারণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে আদালত দুই মন্ত্রীকে ওই দিন আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বেঞ্চ গতকাল রোববার এই আদেশ দেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মো. নিজামুল হক। এর আগে নয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল দিয়েছিলেন। বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান ছুটিতে থাকায় গতকাল শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন না।
গতকাল সকালে আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরুর আগে থেকেই দুই মন্ত্রী আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। সকাল সোয়া নয়টার দিকে আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় দুই মন্ত্রী উঠে দাঁড়ান। পরে তাঁদের বসার অনুমতি দেন প্রধান বিচারপতি। কামরুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন আবদুল বাসেত মজুমদার এবং মোজাম্মেল হকের পক্ষে রফিক-উল হক।

শুরুতে কামরুল ইসলামের দেওয়া ব্যাখ্যা পড়ে শোনান বাসেত মজুমদার। এতে বলা হয়, কামরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য করবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন। ব্যাখ্যার পঞ্চম অনুচ্ছেদে বলা হয়, আবেদনকারী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করতে দেখেছেন। এ জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে ওই বক্তব্য দিয়েছেন।

গত ৬ মার্চ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির আদেশ পাওয়া মীর কাসেম আলীর আপিল মামলা পুনঃশুনানির দাবি জানান এবং এতে প্রধান বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেন। একই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেন। পরে ৮ মার্চ আপিল বিভাগ দুই মন্ত্রীকে আদালতে তলব করেন ও তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল দেন। ১৪ মার্চ দুই মন্ত্রী তাঁদের বক্তব্যের জন্য আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ব্যাখ্যা জমা দেন।

গতকাল খাদ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা পড়ে শোনানোর পর প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দুজন মন্ত্রী যখন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তখন আমি বিদেশে ছিলাম। আমি টেলিফোনে একজন মন্ত্রীকে বলি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করতে। একই সঙ্গে বলেছি দেশে ফেরার আগে দুই মন্ত্রীকে প্রেসের সামনে ক্ষমা চাইতে হবে। মন্ত্রী বললেন, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে দুই মন্ত্রীকে বকাঝকা দিয়েছেন। আমি বললাম, ওই বকাঝকায় কিছু হবে না। পরদিন ক্ষমা না চাইলে কনসিকোয়েন্স (পরিণতি) সাংঘাতিক হবে। মন্ত্রী কোনো কথা বললেন না।’

দুই মন্ত্রীর আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, প্রধান বিচারপতিকে এক হাজার কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে কিনতে পারেন, কিন্তু অন্য চার বিচারপতিকে কিনতে পারবেন না। প্রধান বিচারপতি একা কোনো রায় দেন না।

এ সময় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বলেন, প্রধান বিচারপতি চাইলেও তাঁর পক্ষে একা রায় দেওয়া সম্ভব না। সবার আলাদা আলাদা রায় আছে।

কামরুল ইসলামের আইনজীবী বাসেত মজুমদারকে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার ব্যাখ্যা হয়নি। এটা আমরা খারিজ করলাম।’

মোজাম্মেল হকের আইনজীবী রফিক-উল হককে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জনাব হক, আপনি জনকণ্ঠমামলার রায় পড়েছেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায় মানতে কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি না?’ এ সময় রফিক-উল হক প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, বিচার প্রশাসনে হস্তক্ষেপ—এগুলো ফৌজদারি আদালত অবমাননা। ডাকাতি মামলার আসামির যেমন, তেমনি ফৌজদারি আদালত অবমাননার অপরাধ একই। জনকণ্ঠের রায়ে এটা বলে দেওয়া হয়েছে।

দুই আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা স্বীকার করেছেন যে আপনারা অপরাধ করেছেন। আপনারা কী শপথ নিয়েছেন? আপনারা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। আপনারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। এর পরিণতি কী হবে?’

দুই আইনজীবীর প্রতি প্রশ্ন রেখে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জনকণ্ঠের সাংবাদিকের দোষ স্বীকার করা আর আপনাদের দোষ স্বীকারের মধ্যে বেশ-কম আছে। আপনারা শপথ নিয়েছেন সংবিধান রক্ষা করার, সেই শপথ ভাঙলে কী হতে পারে? দোষ স্বীকার করার পর কী হতে পারে? একজন আসামিকে যখন কাঠগড়ায় এনে বলা হয়—তুমি দোষী না নির্দোষ? আসামি বলল, দোষ স্বীকার করছি, ক্ষমা করেন। তখন আদালত কী করেন? আদালত কি খালাস দেবেন?’