মতামত

একুশ আগস্ট : সরকারিভাবে সফল জঙ্গি হামলা

 

ন্যায়-অন্যায়ের তাত্ত্বিক আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার বড় আকারে সামনে আসে। একটি সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা, তা নির্ভর করে সামাজিক নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর। নিয়মাবলি যদি যথাযথ হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি উপযুক্ত হয়, তবে সমাজ ন্যায়সম্মত পথে চলবে। এই প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্র এবং তার পরিচালনার দায়িত্বে থাকে সরকার আর সেই সরকার গঠন করে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল বা জোট।
আর্থিক দুর্নীতি থেকে শুরু করে ক্ষমতার অপব্যবহার সবই করে ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু কেউ কোনও দিন কি ভাবতে পেরেছে এদেশে একটি দল ক্ষমতায় বসে দেশের প্রধান বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করতে জঙ্গিদের দিয়ে গ্রেনেড হামলা করবে? একুশ আগস্ট ছিল রাষ্ট্রীয় ও সরকারি উদ্যোগে, গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয় অংশগ্রহণে, একটি সফল জঙ্গি হামলা। এখন যে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ, তা এসেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ধারাবাহিকতায়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছিলেন ঘটনার অন্যতম হোতা হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামির (হুজি) প্রধান মুফতি হান্নান। জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান জানিয়েছিলেন, বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও পলাতক তারেক রহমানে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে তারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায়। জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান বলেন, ‘তারেক রহমান আমাদের সব ধরনের সহযোগিতার নিশ্চয়তা দেয়।’

তিনি বলেন, ‘১৮ আগস্ট আমি, আহসান উল্লাহ কাজল, মাওলানা আবু তাহের আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির সরকারি বাসায় যাই। সেখানে আবদুস সালাম পিন্টু, বাবর, মাওলানা তাজউদ্দিন, কমিশনার আরিফ ও হানিফ পরিবহনের হানিফ উপস্থিত ছিল। আবদুস সালাম পিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, কমিশনার আরিফ ও হানিফ সাহেব আপনাদের সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করবে এবং আমাদের সকল প্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে। সে মোতাবেক ২০ আগস্ট মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল ও আহসান উল্লাহ কাজল আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে ১৫টি গ্রেনেড ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করে বাড্ডার বাসায় নিয়ে আসে। ২১ তারিখ আগস্ট মাস, ২০০৪ইং আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলা চালাই।’

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে যা সম্পূর্ণ হয়নি, তা-ই করতে চেয়েছিল ঘাতকরা একুশে আগস্টে। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টায় গ্রেনেড হামলা, হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, তদন্তের নামে জজ মিয়া আবিষ্কার, বিচার বিভাগীয় তদন্ত রসিকতা, ‘আওয়ামী লীগই করেছে, শেখ হাসিনা আঁচলের তলে করে গ্রেনেড নিয়ে গেছে’ বলে প্রচারণা চালানো, টেলিভিশন চ্যানেল থেকে জোর করে ফুটেজ নিয়ে যাওয়া এবং ধ্বংস করে ফেলা, এসবই করেছিল তারা, যারা আজ  খুব বেশি বেশি গণতন্ত্রের কথা বলে। এমনকি সংসদে এ নিয়ে আলোচনা পর্যন্ত করতে দেয়নি সরকারি দল, অথচ সেই সংসদেরই বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল।

বাংলাদেশে যারা সমঝোতার রাজনীতির কথা বলেন তাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়ে এমন সুশীল কথা বলতে হবে। ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট সেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, ১৯৭৫ সালের পর আবার এমন এক ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত করে দিয়েছে, যেখান থেকে আর বের হওয়ার পথ নেই, নেই কোন ধরনের সমঝোতারও।