মতামত

হে মোর দুর্ভাগা দেশ!

আগৈলঝাড়া বাংলাদেশের বরিশাল জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা- আর এই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন গাজী সালমান তারেক- টগবগে তরুণ অফিসার সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষৎ তাঁর- তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি কিন্তু পড়েছেন, শুনেছেন এবং একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ডাকে যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সেই শতাব্দীর মহাপুরুষ রূপকথার প্রবাদপুরুষ বঙ্গবন্ধুকেও ভালভাবে জেনেছেন এবং শ্রদ্ধাসহকারে ভালবেসেছেন- তাঁর হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।
আগৈলঝাড়া উপজেলায় ২০১৭-এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হবে- আমন্ত্রণপত্রের পরিকল্পনার দায়িত্ব নেন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী সালমান তারেক নিজেই- যে আইডিয়াটা তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রথানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকেই নিয়েছেন। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী সালমান তারেক-এর বক্তব্য অনুয়ায়ী- “স্বাধীনতা দিবসে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এক শিশুর আঁকা জাতির জনকের ছবি ব্যবহার করে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ছাপা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি শিশুদের ভালবাসা সৃষ্টি এবং ছবি আঁকার প্রতি তাদের আগ্রহী করে তোলা।
আমন্ত্রণপত্রের প্রথম প্রষ্ঠায় অর্থাৎ কভার পেজে দেওয়া হয় শিশুদেরই আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি- ভিতরের পাতায় বাদিকে মহান স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি এবং ডান দিকে সুধীবৃন্দকে উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কামনা করে আমন্ত্রণ এবং কভার পৃষ্ঠার শেষ পাতায় এক পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর আঁকা বঙ্গবন্ধুর স্কেচ ছবি।
আমি মহান মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৬ বছরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশে যা দেখেছি এবং দেখছি সে দৃষ্টিকোন থেকে বলছি- বাংলাদেশের ৪৬ বছরের ইতিহাসে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব গাজী সালমান তারেক মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন- এই ৪৬ বছরে উপজেলা দূরের কথা কোনো জেলা বা বিভাগীয় শহরেও এরধনের আমন্ত্রণপত্র একটিও ছাপা হয়নি।
কভার পেজের প্রথম পৃষ্ঠায় শিশুদেরই আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবিটি হলো- একদল কিশোর মুক্তিযোদ্ধা এ্যামবুস পেতে বসে আছে এবং একটি হানাদার পাকিস্তানি সাঁজোয়া গাড়ি আসা মাত্র কিশোর মুক্তিযোদ্ধারা একযোগে ব্রাস ফায়ার করে আক্রমন করে এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের গাড়িটি আগুনের লেলিহান শিখায় পাকিস্তানি আর্মি সহ জ্বলতে দেখা যায়। আঁকা ছবিতে ভাবভঙ্গিমায় বুঝা যাচ্ছে বিজয়ের পর একজন মুক্তিযোদ্ধা জয়বাংলা শ্লোগান দিচ্ছে। এধরনের আর্টকরা রঙিন ছবি স্বাধীনতার পরপর রিক্সার বড়ির পিছনে এবং পিছনের নিচে দুইচাকার মাঝখানে শোভা পেতো- এছাড়াও বেবিটেক্সির বডির পিছনে এবং ট্রাকের ডালার মধ্যে যেখানে ‘সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন’ লেখা থাকতো সেখানে সগৌরবে শোভা পেতো- কিন্তু পচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের সবছবিগুলো রাতারাতি সব হাওয়া হয়ে যায় এবং বিপরীতে সিনেমার অশ্লীল ছবি শোভা পায় যেটা এখানো অব্যাহত আছে।
ভিতরের ২য় পৃষ্ঠায় শিরোনাম ছিল- ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০১৭ উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচি’- এখানে শিরোনামে ‘মহান’ কথাটা উচ্চারণ করা হয়েছে। ভিতরের তৃতীয় পৃষ্ঠায় ঝাপসা হলেও পড়ে যতটুকু বুঝেছি সেটাই এখানে উল্লেখ করছি।
প্রিয় সুধী,
২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এই দিনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল গোটা বাঙালি জাতি।
এ দিবসটি উদযাপনের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন, আগৈলঝাড়া, বরিশাল-এর উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
এ কর্মসূচিতে আপনার সবান্ধব উপস্থিতি কামনা করছি।


(গাজী সালমান তারেক)
উপজেলার নির্বাহী অফিসার, আগৈলঝাড়া, বরিশাল।


এখানে দেখা যাচ্ছে: ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ মহান কথাটা উচ্চারণ করা হয়েছে। ‘বাঙালি জাতি’ উচ্চারণ করা হয়েছে। ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী’ অর্থাৎ ‘পাকিস্তান’ কথাটা উচ্চারণ করা হয়েছে এবং ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ কথাটা শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা হয়েছে। আমারতো মনে হয় বঙ্গবন্ধুর এই ছবিটি আগে পেলে তাঁরই কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আমন্ত্রণপত্রে এই ছবিটি ব্যবহার করতেন।
এবং শেষ পৃষ্ঠায় ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর আঁকা বঙ্গবন্ধুর একটি সুন্দর স্কেচ করা ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে বাংলাদেশের পতাকা। ছবিটি এতো নিঁখুত যে বঙ্গবন্ধুর গালের তিলটিও বাদ যায়নি। একটা কথা স্মরণে রাখতে হবে ছবিটি এঁকেছে ৫ম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী- এই ক্ষুদে শিক্ষার্থী একজন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন নয়, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী নয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী শাহাবুদ্দিনও নয়।
অথচ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আমন্ত্রণপত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃতি ও অবমাননার অভিযোগে গত ৭ জুন ২০১৭ জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ওবায়েদুল্লাহ সাজু বাদী হয়ে আগৈলঝাড়ার ইউএনও গাজী তারেক সালমানের বিরুদ্ধে বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। দায়ের করা মামলায় বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজী তারেক সালমানকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। দুই ঘণ্টা হাজতবাসের পর আদালতের আদেশে অন্তবর্তীকালীন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন ইউএনও গাজী তারেক সালমান। আগৈলঝাড়ার ইউএনও গাজী তারিক সালমানকে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদে বদলি করা হয়।
এখানে মন্তব্য করার কিছুই নেই- শুধু এটুকুই বলবো, শেষ সব শেষ- আতঙ্কে এখন শিশুরা আর মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো ছবি আঁকবে না- এমন কি অভিভাবকগণও আর এধরনের ছবি অঙ্কনের জন্য উৎসাহ দিবেন না বরং বাধা দিবেন। বাংলাদেশের কোনো উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা আর বঙ্গবন্ধুর ছবি বা মুক্তিযুদ্ধের ছবি সম্বলিত কোনো আমন্ত্রণপত্রের কার্ড ছাপাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। তবে সুখের বিষয় সারা বাংলাদেশে একমাত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘আমরাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ নামে কিশোর-তরুণদের একটি সংগঠন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে মহান মুক্তিযুদ্ধের রঙিন ছবি এঁকে বিপ্লব ঘটিয়ে দিচ্ছে- যা বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তবে আগৈলঝাড়ার ইউএনও গাজী তারিক সালমানের এই পরিণতির পর একটা অজানা আতঙ্কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘আমরাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ নামে কিশোর-তরুণদের সংগঠন-এর উপর এর প্রভাব পড়বে কিনা জানি না।
৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর অঙ্কিত বঙ্গবন্ধুর এই স্কেচ ছবিটির ব্যাপারে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির একটি বক্তব্য বা মন্তব্য আশা করছি- তানাহলে শিশু একাডেমি কাদের জন্য? ৫ম শ্রেণীর এই ক্ষুদে শিল্পীকে কীভাবে ধন্যবাদ জানাবো জানিনা। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে যেভাবে স্যালুট দিতাম ঠিক সেভাবেই আগৈলঝাড়ার ইউএনও জনাব গাজী তারেক সালমানকে স্যালুট দিচ্ছি- তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। সবশেষে রবীন্দ্রনাথের ‘অপমানিত’ কবিতার ভাষায় বলবো-
“হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান/ অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান’’

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা(২নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া)